অস্ট্রেলিয়ায় নারী রোগীদের যৌন হয়রানি: বাংলাদেশি চিকিৎসকের ১০ অপরাধে দোষ স্বীকার
অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া নারী রোগীদের যৌন হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন স্পর্শের ঘটনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসক শফিউল মিল্কি (৬২) ১০টি অপরাধে দোষ স্বীকার করেছেন। ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের ওশান গ্রোভ ও নরলেন এলাকায় চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় এসব ঘটনা ঘটে বলে আদালতের নথিতে উঠে এসেছে।
গত বছরের ৪ জুন মেলবোর্নের কাউন্টি কোর্টে হাজির হয়ে এসব অপরাধে দোষ স্বীকার করেন মিল্কি। তবে আদালতের আরোপিত প্রকাশনা নিষেধাজ্ঞার কারণে এত দিন বিষয়টি প্রকাশ করা যায়নি। সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে এসেছে।
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, দোষ স্বীকার করা ১০টি অপরাধের মধ্যে রয়েছে তিনটি অশালীন আক্রমণ, ছয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন স্পর্শ এবং এক নারী রোগীকে দিয়ে তাঁকে যৌনভাবে স্পর্শ করানোর ঘটনা।
অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসার সময় রোগীদের শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে চিকিৎসাগত প্রয়োজনের বাইরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করতেন মিল্কি। চিকিৎসকের ওপর আস্থা রেখে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন নারী এমন আচরণের শিকার হন।
ভুক্তভোগীদের একজন ফ্রান মিলিংটন নিজের পরিচয় প্রকাশ করে আদালতে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ওশান গ্রোভের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে গেলে শফিউল মিল্কি তাঁর অন্তর্বাস নামিয়ে শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন।
এদিকে পৃথক একটি ধর্ষণের অভিযোগে শফিউল মিল্কিকে খালাস দিয়েছেন আদালত। গত বুধবার (৭ অক্টোবর) পাঁচ দিনব্যাপী বিচার শেষে মেলবোর্নের কাউন্টি কোর্টের জুরি তাঁকে ওই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেননি।
ওই নারী ২০১৮ সালের মার্চে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে জরায়ুমুখের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলাকালে ধর্ষণের অভিযোগ করেছিলেন। তবে মিল্কির আইনজীবীরা অভিযোগ অস্বীকার করে আদালতে দাবি করেন, পরীক্ষায় ব্যবহৃত যন্ত্রের কারণে ওই নারী যে ধরনের অনুভূতির কথা বলেছেন, তা হয়ে থাকতে পারে। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিবেচনা করে জুরি তাঁকে ওই অভিযোগ থেকে খালাস দেন।
তবে পৃথক ধর্ষণ মামলায় খালাস পেলেও চার নারী রোগীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০টি যৌন অপরাধে মিল্কির দোষ স্বীকার বহাল রয়েছে। এসব অপরাধের সাজা এখন নির্ধারণ করা হবে।
শফিউল মিল্কির বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের মামলা কয়েক বছর ধরে চলমান। এর আগে ২০২৩ সালে ছয় নারী রোগীর সঙ্গে যৌন অপরাধের ১৫টি অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। একই বছরের এপ্রিলে আদালত তাঁকে সাড়ে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেন। এর মধ্যে অন্তত ১১ বছর কারাগারে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরে ২০২৪ সালের জুনে ভিক্টোরিয়ার আপিল আদালত আগের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি পাওয়ায় সেই দণ্ডাদেশ বাতিল করে পুনর্বিচারের নির্দেশ দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ ব্যবহারের বিষয়ে জুরিদের যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের হাজির না করার বিষয়টিও বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছিল।
পুনর্বিচারের প্রক্রিয়া চলার সময়ই চার নারী রোগীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০টি যৌন অপরাধে দোষ স্বীকার করেন মিল্কি। অন্যদিকে পৃথক ধর্ষণের অভিযোগে বিচার শেষে তিনি খালাস পান।
জানা গেছে, শফিউল মিল্কি বাংলাদেশে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে নিউজিল্যান্ডে যান এবং ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। জন্মসূত্রে বাংলাদেশি হলেও তিনি নিউজিল্যান্ডের নাগরিক।
দোষ স্বীকার করা ১০টি অপরাধের সাজা নির্ধারণে আগামী ২৩ অক্টোবর আদালতে পরবর্তী কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে পৃথক ধর্ষণ অভিযোগ থেকে খালাস পেলেও চার নারী রোগীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌন অপরাধগুলোর জন্য তাঁকে সাজা নির্ধারণের মুখোমুখি হতে হবে।