মেনু
সংবাদ টাইমস | Bd News
শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা
কনভার্টার

সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে যত প্রশ্ন

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬ 44 বার পঠিত
সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে যত প্রশ্ন
ছবি : ফাইল ফটো

অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের অন্যতম স্কিন ক্যানসারের হটস্পট, যেখানে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার মানুষ স্কিন ক্যানসার এবং মেলানোমায় মারা যায় এবং প্রতি তিনজন অস্ট্রেলিয়ানের মধ্যে প্রায় দুই জনের জীবনে অন্তত একবার স্কিন ক্যানসারের জন্য অস্ত্রোপচার করাতে হবে বলে ধারণা করা হয়। এমন একটি দেশে যেখানে সানস্ক্রিন একটি দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস, সেখানে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া একটি বিতর্ক বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করে।

ভোক্তা অধিকার সংস্থা ‘চয়েস’-এর অনুসন্ধানে দেখা যায় যে, ২০টি জনপ্রিয় সানস্ক্রিনের মধ্যে ১৬টিই তাদের লেবেলে উল্লিখিত এসপিএফ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনাটি হলো এসপিএফ ৫০ প্লাস হিসেবে বাজারজাত করা একটি পণ্য, যা পরীক্ষায় প্রায় এসপিএফ ৪-এর মতো কাজ করেছে বলে জানা যায়। ব্র্যান্ডটি এই ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানালেও পণ্যটি বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং এরপর থেকে অস্ট্রেলিয়ার থেরাপিউটিক গুডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন একই ধরনের সানস্ক্রিনের বিভিন্ন পরীক্ষাগারের ফলাফলে কেন এত বড় অমিল দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করে।

এই বিতর্কটি বাংলাদেশের অনেক ভোক্তার মধ্যে প্রচলিত একটি বিশ্বাসকেও নাড়া দিয়েছে। কেননা, আমাদের দেশে অনেকেই মনে করেন যে আমদানি করা পণ্য ত্বকের যত্নের জন্য স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য। কিন্তু এই সংবাদটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র একটি পরিচিত ব্র্যান্ডের নামই এখন আর যথেষ্ট নয়। সানস্ক্রিনটি কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের হোক বা কোনো স্থানীয় কোম্পানির, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটি তার লেবেলে লেখা সুরক্ষা সত্যিই প্রদান করে কি না। এই বিষয়টি ক্রমশ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা আরও বেশি মানুষকে প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর জন্য অনেকেই সানস্ক্রিন ব্যবহার করা এড়িয়ে চলেন, কারণ এটি ত্বককে তৈলাক্ত বা চটচটে করে ফেলে, অথবা ব্যবহারের ফলে ত্বকে হোয়াইট কাস্ট রেখে যায়। এছাড়া, অন্য দেশের জলবায়ুর জন্য তৈরি কোনো ফর্মুলা বাংলাদেশের দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সবসময় স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে। সানস্ক্রিনের আসল কার্যকারিতা তখনই, যখন সেটি নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। শুধু ভালো পরীক্ষার ফল থাকলেই হবে না। তাহলে গ্রাহকরা কীভাবে জানবেন যে একটি সানস্ক্রিন সত্যিই কাজ করে কিনা? প্রথম ধাপ হলো লেবেলের অর্থ বোঝা। এসপিএফ বা সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টর, ইউভিবি রশ্মির বিরুদ্ধে সুরক্ষার মাত্রা পরিমাপ করে, যা মূলত সানবার্নের কারণ। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে, একটি এসপিএফ ৫০ সানস্ক্রিন এই রশ্মিগুলোর প্রায় ৯৮ শতাংশ আটকে দেয়। কিন্তু এসপিএফ হলো সম্পূর্ণ চিত্রের একটি অংশ মাত্র। পিএ রেটিং ইউভিএ রশ্মির বিরুদ্ধে সুরক্ষা নির্দেশ করে, যা ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে এবং ট্যানিং, পিগমেন্টেশন ও অকাল বার্ধক্যের সাথে সম্পর্কিত। এই দুটি রেটিং একত্রে দেখায় যে একটি সানস্ক্রিন সূর্যের তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় ধরনের ক্ষতি থেকে কতটা ভালোভাবে সুরক্ষা দেয়।

দ্বিতীয় ধাপটি হলো, এই সংখ্যাগুলো কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে তা জিজ্ঞাসা করা। সব এসপিএফ পরীক্ষা একই রকম নয়। ইন-ভিভো পরীক্ষায় পণ্যটি মানব স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর প্রয়োগ করা হয় এবং নিয়ন্ত্রিত ইউভি রশ্মির সংস্পর্শে ত্বক কখন লাল হতে শুরু করে তা পরিমাপ করা হয়; এটি এমন একটি পদ্ধতি যা বেশিরভাগ বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো চূড়ান্ত বলে মনে করে এবং অস্ট্রেলিয়ার গবেষণার ফলাফল বের করার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল। ইন-ভিট্রো পরীক্ষায় একটি স্পেকট্রোফটোমিটার ব্যবহার করে পণ্যের একটি পাতলা স্তরের মধ্য দিয়ে কী পরিমাণ ইউভি রশ্মি প্রবেশ করে তা পরিমাপ করা হয়। এটি দ্রুততর, সাশ্রয়ী এবং শিল্পজুড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যদিও এটি মানব গবেষণার পরিবর্তে একটি পরীক্ষাগারভিত্তিক বিকল্প পদ্ধতি। কিন্তু মূল বিষয় হলো কোনো পদ্ধতিই চূড়ান্ত নয়, এবং এমনকি একই পণ্যের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পরীক্ষাগারের ফলাফল ভিন্ন হতে পারে, যা অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন খতিয়ে দেখছে। ভোক্তাদের উচিত যে ব্র্যান্ডগুলো তাদের পরীক্ষাগার, পদ্ধতি এবং ফলাফল উল্লেখ করতে ইচ্ছুক সেই পণ্যগুলো কেনা, শুধুমাত্র নামী ব্র্যান্ডের বোতলের ওপর একটি ছাপানো লেবেল দেখে নয়।

বিশ্বব্যাপী সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা নিয়ে বাড়তি নজরদারির পর, কিছু স্থানীয় স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ডও এখন বাহ্যিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের পণ্যের কার্যকারিতা প্রমাণে গুরুত্ব দিচ্ছে। স্কিন ক্যাফে এমনই একটি উদাহরণ। এই বাংলাদেশী ব্র্যান্ডটি তাদের ‘স্কিন ক্যাফে সানস্ক্রিন এসপিএফ ৫০ পিএ ট্রিপল প্লাস উইথ ভিটামিন সি’ পণ্যটি তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষার জন্য ঢাকা-ভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইএসও/আইইসি ১৭০২৫:২০১৭ স্ট্যান্ডার্ডে স্বীকৃত ল্যাবরেটরি ওয়াফেন রিসার্চ ল্যাবরেটরি লিমিটেডে জমা দিয়েছে। এএনএ-২৪০৭২৪০০২/১ রিপোর্ট রেফারেন্স অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এই পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ল্যাবভিত্তিক ইউভি স্পেকট্রোফোটোমেট্রি পদ্ধতি ব্যবহার করে সানস্ক্রিনের সুরক্ষা ক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। কোম্পানির শেয়ার করা ল্যাবরেটরি রিপোর্ট অনুযায়ী, সানস্ক্রিনটির এসপিএফ মান ৫২ দশমিক ৫১ পাওয়া গেছে, যা এর প্যাকেজিংয়ে উল্লিখিত এসপিএফ ৫০-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোম্পানিটির মতে, পরীক্ষায় এসপিএফ ৫০-এর সামান্য বেশি ফল পাওয়া মানে এই নয় যে পণ্যটি দাবির চেয়ে বেশি কার্যকর। বরং এটি প্রমাণ করে যে প্যাকেজিংয়ে উল্লেখ করা এসপিএফ ৫০-এর দাবিটি সঠিক। কারণ এসপিএফ পরীক্ষায় এ ধরনের সামান্য পার্থক্য স্বাভাবিক বলে ধরা হয়।

স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্তটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরে। একটি সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা শুধু পরীক্ষাগারের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর মানুষ তখনই প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করবে, যখন সেটি তাদের দেশের আবহাওয়ায় আরামদায়ক লাগবে। শীতল ও শুষ্ক বাজারের জন্য তৈরি কোনো পণ্যকে মানিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে, বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী করে ফর্মুলেশন ও পরীক্ষা করা স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য এমন একটি উদ্যোগ, যা পরীক্ষাগারের ফলাফল এবং বাস্তব জীবনের ব্যবহার, এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে পারে।

তবে কোনো পরীক্ষার ফলকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা একটি পণ্যের প্রতি আস্থা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও, সেটিই শেষ কথা নয়। একজন ভোক্তা হিসেবে কোন পদ্ধতিতে, কখন এবং কোন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করা হয়েছে, তা জানার ও প্রশ্ন করার অধিকার সবারই রয়েছে। কারণ, অস্ট্রেলিয়ার বিতর্কটি দেখিয়ে দিয়েছে যে, আকর্ষণীয় মোড়ক এবং উচ্চ এসপিএফ-এর দাবি এখন আর এককভাবে যথেষ্ট নয়। সানস্ক্রিনটি আমদানি করা হোক বা স্থানীয়, ভোক্তাদের পরীক্ষার প্রমাণ ও স্বচ্ছতা জানার অধিকার রয়েছে, আর ব্র্যান্ডগুলোরও তা নিশ্চিত করা উচিত।

লাইফস্টাইল থেকে আরও দেখুন

নিচে স্ক্রল করলে পরবর্তী সংবাদ আসবে