সিলেটে চৌকিদারকে সামনে রেখে ইউপি চেয়ারম্যান আজাদের দখল মিশন
সিলেটের খাদিমপাড়ার সবুজ পাহাড় আর প্রাকৃতিক শোভায় ঘেরা ‘এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ (যা একসময়ের জনপ্রিয় জাকারিয়া সিটি নামে পরিচিত)—একসময় যেখানে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকার কথা, সেখানে এখন ভর করেছে চরম অনিশ্চয়তা আর অস্ত্রের ঝনঝনানির আতঙ্ক। একটি প্রতিষ্ঠিত পর্যটন কেন্দ্র জোরপূর্বক কবজায় নিতে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র মরিয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগের তীর খোদ ৪ নম্বর খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বদরুল ইসলাম আজাদ ও তার বিশ্বস্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে।
প্রশাসন ও স্থানীয়দের সামাজিক সালিশের তোয়াক্কা না করে দখলচেষ্টা, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পাওয়া এবং থানা থেকে বের হয়েই ফের হুমকি-চাঁদাবাজির এক ছায়াযুদ্ধ চলছে খাদিমপাড়ার এই রিসোর্টটিকে ঘিরে।
রিসোর্টটির মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি সামাজিক বিচার-সালিশ চলমান ছিল। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে বিষয়টি গায়ের জোরে নিষ্পত্তির পথ বেছে নেয় চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ চক্রটি।
২০ অক্টোবর রিসোর্টের সাবেক চৌকিদার মো. শহিদুল ইসলাম, সাঈদ, মালেক ও ফয়জুলের নেতৃত্বে একদল লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হঠাৎ রিসোর্টটিতে অনধিকার প্রবেশ করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, নিমিষেই রিসোর্টের মনোরম পরিবেশ রণক্ষেত্রে রূপ নেওয়ার উপক্রম হয়। তবে বর্তমান বৈধ লিজগ্রহীতা রাহাত চৌধুরী মুন্নার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাহসিকতার সাথে রুখে দাঁড়ালে প্রথম দফার দখলচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শাহপরাণ (রহ.) থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ সেখান থেকে সাবেক চৌকিদার শহিদুল ইসলামসহ মো. আম্বর আলী, মো. সিরাজ উদ্দিন ও মো. সামাদ আহমদকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
আটকের পর পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। আটককৃতদের ছাড়িয়ে নিতে থানায় হাজির হন স্বয়ং ইউপি চেয়ারম্যান বদরুল ইসলাম আজাদ। পরবর্তীতে লিজগ্রহীতা ও চেয়ারম্যান পক্ষের উপস্থিতিতে একটি আইনি সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করা হয়।
থানায় দেওয়া লিখিত মুচলেকায় আটককৃতরা স্পষ্ট অঙ্গীকার করেন—আইনগতভাবে বৈধ মালিকানা বা প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত তারা নিজে কিংবা অন্য কোনো লোক মারফত জাকারিয়া সিটির কোনো বিষয়ে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করবেন না এবং কোনো বাধার সৃষ্টি করবেন না।
কিন্তু সেই লিখিত অঙ্গীকারনামার কালি শুকাতে না শুকাতেই দৃশ্যপট আবারও বদলে যায়। অভিযোগ উঠেছে, থানা থেকে ছাড়া পেয়েই চেয়ারম্যান আজাদের প্রত্যক্ষ মদদে শহিদুল, সাঈদ, মালেক ও ফয়জুল ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। রিসোর্টে নিয়মিত প্রবেশ করে কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতে হলে দিতে হবে মোটা অঙ্কের চাঁদা—এমন দাবি নিয়ে প্রতিদিন ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। রিসোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছেন।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান লিজগ্রহীতা রাহাত চৌধুরী মুন্না ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া মেনে এবং বৈধ কাগজপত্রের ভিত্তিতে এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট পরিচালনা করছি। বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ ও শতাধিক কর্মীর কর্মসংস্থান এখানে জড়িয়ে আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল পেশিশক্তি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি গিলে খেতে চাইছে। তারা মুচলেকাকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
এ বিষয়ে শাহপরাণ (রহ.) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমদ বলেন, শাহপরাণ থানা এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। কেউ যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, এতসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা খাদিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বদরুল ইসলাম আজাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা সিলেটের এই ঐতিহ্যবাহী বিনোদন ও আতিথেয়তা কেন্দ্রটি প্রভাবশালীদের দখল-রাজনীতির বলি হবে, নাকি আইনের শাসনের মাধ্যমে স্বস্তির সুবাতাস ফিরে পাবে—এখন সেটাই দেখার বিষয়।