সিলেটে চোরাচালানের নায়ক ‘জামাই-শ্বশুর’!
সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর এখন চোরাচালানের নিরাপদ রুট। একসময়ের শান্ত সীমান্ত এলাকা এখন ভারতীয় চিনি, জিরা, মাদক ও বিড়ির অবৈধ বাণিজ্যের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের পান্তুমাই গ্রামের আব্দুল মালিক ওরফে ‘ছুবা মালিক’ এবং তার মেয়ের জামাই হাতিরখাল গ্রামের সামসুদ্দিন ওরফে ‘শ্যাম কালা’র নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক চোরাচালান সিন্ডিকেট। প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে তারা গড়ে তুলেছে বিশাল এক অবৈধ সাম্রাজ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সোনারহাট বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকা দিয়ে প্রতিদিন শত শত গাড়ি অবৈধ পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্যরা জানায়, প্রতি বস্তা চিনি থেকে ১৬০ টাকা এবং প্রতি খাচা বিড়ি থেকে ৬৫০ টাকা ‘সালামি’ হিসেবে আদায় করা হয়। এছাড়া মাদকের প্রতিটি চালানের জন্য ১ হাজার টাকা করে সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। দৈনিক অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি গাড়িতে করে এসব পণ্য তামাবিল ও এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে সিলেট শহরে ছড়িয়ে পড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চোরাকারবারী জানায়, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ‘ম্যানেজ’ করে এই টাকা দেওয়া হয়, তাই বাধা দেওয়ার কেউ নেই।
আব্দুল মালিক ও তার জামাই শ্যাম কালা নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ‘লাইনম্যান’ পরিচয় দিয়ে এই অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও থানা পুলিশের একাংশের নাম ব্যবহার করে তারা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তাদের শেল্টারে চোরাকারবারীরা বীরদর্পে গরু, মহিষ, মোবাইল, শাড়ি-লেহেঙ্গা, চা-পাতা ও মাদকের বড় বড় চালান পার করছে। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের হার বেশ ধীর।
সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক ও চোরাচালানের এমন ভয়াবহ বিস্তার সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এভাবে চোরাচালান চলতে থাকলে একদিকে দেশীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে যুবসমাজ মাদকের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল বলেন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক স্যারের দিকনির্দেশনায় আমরা মাদক ও চোরাচালান বিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। গোয়াইনঘাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আব্দুল মালিক এবং শ্যাম কালাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে সীমান্তকেন্দ্রিক এই চোরাচালান সিন্ডিকেট দমনে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই। স্থানীয়রা বলছেন, যদি শুধু ‘সালামি’র বিনিময়ে দেশের সীমান্ত অরক্ষিত থাকে, তবে রাষ্ট্রবিরোধী এই অপরাধের দায় কার? জামাই-শ্বশুরের এই সিন্ডিকেটকে দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে সিলেটে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।