কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণে স্মৃতিচারণায় আবিল হলেন বিশিষ্টরা

0
113

#সৌমিত্র_চট্টোপাধ্যায়:  বাংলা-সহ সমগ্র দেশ ও বিশ্ব সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ। বিশিষ্টরা কিংবদন্তি শিল্পীর মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া ও স্মৃতিচারণায় আবিল হলেন। চলচ্চিত্র অনুরাগীরা মনে করেন যে ভারতীয় ছবির আর এক কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের তিনি ছিলেন ‘মানসপুত্র,’। সত্যজিৎপুত্র সন্দীপ রায় জানালেন যে সৌমিত্রর প্রয়াণে পরিবারের এক সদস্যকে হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করছেন। তাঁর কথায়, ‘বাবার সঙ্গে এক অদ্ভূত কেমিস্ট্রি কাজ করত সৌমিত্রবাবুর। সুদীর্ঘ সম্পর্ক ছিল আন্তরিকতায় মাখা। অশনি সংকেত ছবির শ্যুটিংয়ের সময় ওঁকে ক্যামেরার ট্রলি ঠেলতেও দেখেছি। ওঁর সঙ্গে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক সুদীর্ঘ ও গভীর।’

অভিনেতা দীপংকর দে শোকার্ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে। পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এক সময় একই পাড়ায় আমরা থাকতাম।’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেন বাংলা ছবির জনপ্রিয় জুটি হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন। অপর্ণা সেন তার সহ-অভিনেতা ও পরম সুহৃদের প্রয়াণ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগমথিত হয়ে পড়েন। কোনওক্রমে তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমি বেশি কিছু বলার অবস্থায় নেই। বইপড়া নিয়ে ও আরও নানান বিষয়ে আমাদের অনেক আড্ডা হত। দীর্ঘ বন্ধুত্বের অসংখ্য টুকরো মুহূর্ত মনে পড়ে যাচ্ছে।’

অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একাধিক ছবিতে জনপ্রিয় জুটি হিসেবে কাজ করেছেন । রবিবার তিনি বলেন, ‘ও কোনও দিন মরবে না। ওর কাজের মধ্যে দিয়ে, ওর স্মৃতির মধ্যে দিয়ে চিরদিন ও বেঁচে থাকবে মানুষের মনে। কাজের ফাঁকে হাসি-ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখতেন সকলকে। ওঁর মার্জিত ব্যবহার সবাইকে মুগ্ধ করেছে বারে বারে।’

Advertisement

শর্মিলা ঠাকুর শুধু তাঁর প্রথম ছবির সহ-অভিনেত্রীই নন সুদীর্ঘ ছয় দশকের কেরিয়ারে একাধিক ছবি জনপ্রিয়তা সৌমিত্র-শর্মিলা জুটিকে শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল । শর্মিলা ঠাকুর এ দিন সতীর্থ ও বন্ধুর প্রয়াণে ভেঙে পড়েছেন। প্রতিক্রিয়ায় জানালেন, ‘অনেক দিন ধরেই ভুগছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে উঠবেন। উনি ছিলেন আমার বহু পুরনো বন্ধু। ওঁর মতো কে আছে আর? ওঁর অভিনয়, নাট্য পরিচালনা, সাহিত্য যা অবদান, তা যে ঐতিহ্যের পত্তন করেছে, তা চিরন্তন। ওঁর আবৃত্তি অসাধারণ। উনি চলে গেলেন, কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক দিন উনি বেঁচে থাকবেন। আজ আমি অত্যন্ত শোকাহত, বড় দুঃখের দিন। অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির শ্যুটিংয়ে উত্তরবঙ্গের এক ডাক বাংলোয় সৌমিত্র, শুভেন্দু ও আমি ছিলাম। রোজ কাজের পরে আমাদের আড্ডা জমত নানান বিষয়ে। উনি এত বিষয়ে গভীর ভাবে জানতেন যে, বারে বারে মুগ্ধ হয়েছি। এই অভাব অপূরণীয়।’

মানুষ হিসেবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অনাবিল উষ্ণ ব্যবহারের স্মৃতিচারণা করে অগ্রজ অভিনেতার সঙ্গে কাজ ও অবসরের ফাঁকে বিভিন্ন মুহূর্তের কথা রোমন্থন করেছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন যে কোনও এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে উদ্যোক্তারা গাড়ির ব্যবস্থা করতে সমস্যায় পড়লে বিদগ্ধ অভিনেতা হাসিমুখে ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরার বিকল্প উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

মাত্র ৬ বছর বয়সে অভিনেতা কুশল চক্রবর্তীর সোনার কেল্লা ছবির সূত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘ওঁর মতো উচ্চতার মানুষ এত সহজ-সরল ব্যবহার করতেন বরাবর, যা ভাবতেই পারা যেত না। আজ চলচ্চিত্র জগতের এক পথনির্দেশককে হারালাম।’
অভিনেতা শ্বাশ্বত চট্টোপাধ্যায় সৌমিত্রর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের কথা জানিয়েছেন তিনি বলেন, ‘সৌমিত্র শুধু অভিনেতা নন, নাট্যকর্মী, পরিচালক, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ। তাঁর অভাব অপূরণীয়। আমার বাবার সঙ্গে যেমন বন্ধুত্বব ছিল, তেমনই আমাদের মতো কমবয়েসিদের সঙ্গেও তিনি অতি সাবলিল ভাবে মেলামেশা করতেন।’

নাট্যকর্মী শিল্পী গৌতম হালদার জানান, ‘আপামর বাঙালির কাছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নামটি শিহরণ জাগায়। গত কয়েক বছরে তাঁকে এক বন্ধু হিসেবে পেয়েছি। নাট্যমঞ্চে একসঙ্গে কাজ করার সময় ওঁর থেকে শিখেছি পরিমিতি বোধ, সংলাপকে কী করে শরীরী ও মনের ভাষায় একাকার করতে হয়, সেই শৈলী। পরে ছবিতে অভিনয়ের সময়ও তাঁর কাছে শিখেছি অভিনয়ের অজস্র বিষয়।’

Leave a Reply